খেলতে খেলতে শিশুরা শিখবে কোডিং এবং রোবোটিক্স। দেশে তৈরি বৈদ্যুতিক পাওয়ারট্রেইন ব্যবহার করা যাবে পরিবহন ও কৃষিকাজে। আবার স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে জানা যাবে, কোন কোন স্কুলের আশপাশে রয়েছে ইটভাটা এবং সেগুলো কতটা দূষণের ঝুঁকিতে। এমন আটটি উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ অংশ নেয় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প জায়গা করে নেয় মেলার সেরা ৫০ উদ্ভাবনের তালিকায়।

 

ঢাকার নভোথিয়েটারে ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনের এই মেলা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত মেলায় ছিল এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন। অংশ নেন ৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা। এ ছাড়া শতাধিক শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং ৫০টির বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়।

 

সেরা ৫০-এ জায়গা পাওয়া আইইউবির প্রকল্প দুটি হলো আইইউবি৩৬০’র ‘পিক্সো’ এবং গ্রিন এনার্জি রিসার্চ সেন্টারের (জিইআরসি) ‘অ্যাফোর্ডেবল ৬০ভি ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেইন’। মেলা চলাকালে ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেইন প্রকল্পটি দেখতে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পের সদস্যরা তাঁকে প্রযুক্তিটি সম্পর্কে জানান এবং টেকসই পরিবহন ও কৃষিতে এর সম্ভাব্য ব্যবহার তুলে ধরেন।

 

শিশুদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ভিন্ন ধরনের ধারণা নিয়ে এসেছে পিক্সো। এটি মূলত স্মার্ট ম্যাগনেটিক রোবোটিকস ব্লকের একটি ব্যবস্থা। কোনো তার ছাড়াই ব্লকগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে দেওয়া যায়। এগুলো দিয়ে হাতে-কলমে কাজ করতে করতে শিশুরা কোডিং, ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল ও রোবোটিক্স সম্পর্কে শিখতে পারে।

 

পিক্সোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও আইইউবির সিএসই বিভাগের শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ইউসা ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু রোবোটিক্স কিট বানাতে চাই না। শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে চাই, যাতে আগামী দিনের চিন্তক, নির্মাতা ও উদ্ভাবক হিসেবে তারা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে।’

 

আইইউবির স্টলে আরও ছয়টি প্রকল্প প্রদর্শিত হয়। এসব প্রকল্পে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছেন আইইউবির শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা।

 

এর মধ্যে ‘কিলনওয়াচ’ স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুলের আশপাশের ইটভাটা চিহ্নিত করে। এর মাধ্যমে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে একাধিক ইটভাটা রয়েছে, তা জানা যায়।

 

সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়কে সহজ করে শেখানোর চেষ্টা করেছে ‘ক্রিপ্টোকিউব’। প্রকল্পটির দলনেতা ও সিএসই বিভাগের দশম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মো. আবিদ হাসান ফুয়াদ বলেন, ‘গেম, গল্পভিত্তিক মিশন, ধাঁধা আর টাচস্ক্রিনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এনক্রিপশন, পাসওয়ার্ড নিরাপত্তা ও নিরাপদ যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো শেখে। তত্ত্ব মুখস্থ না করে তারা খেলতে খেলতেই বিষয়গুলো বুঝতে পারে।’

 

‘কগনিলিংক’ একটি পরিধানযোগ্য যন্ত্র। এটি আঙুলের নড়াচড়া শনাক্ত করে নির্দিষ্ট শব্দ বা বাক্যকে শব্দে রূপ দিতে পারে। কথা বলা বা চলাচলে সমস্যার মুখোমুখি মানুষের জন্য প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে। ‘সুইচলোরা’ প্রকল্পে সফটওয়্যার-ডিফাইন্ড রেডিও ও লোরা প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করে তারহীন কণ্ঠ যোগাযোগ নিয়ে কাজ করা হয়েছে। ‘গর্ভসঙ্গী’ বাংলা ও ইংরেজি ভাষার একটি অ্যাপ, যার লক্ষ্য গর্ভাবস্থায় ও সন্তান জন্মের পর মায়েদের মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করা।

 

‘রিফিনএয়ার’ কাজ করে ঘরের ভেতরের বায়ুর মান নিয়ে। সেন্সর, বায়ুপ্রবাহের সিমুলেশন, স্যাটেলাইটের তথ্য, দূষণের মানচিত্র এবং স্বয়ংক্রিয় বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা ব্যবহার করে ঘরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রকল্পে।

 

মেলায় আইইউবির স্টল ঘুরে দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেইন এবং উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম। তাঁরা বিভিন্ন প্রকল্পের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। আইইউবির জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরাও মেলায় অংশ নেওয়া তরুণ উদ্ভাবকদের সঙ্গে ছিলেন।

 

শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প যেন প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতাতেই থেমে না যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে এ বছর ‘ইনোভেশন টু ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ চালু করেছে আইইউবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন—আইইউবি ৩৬০-এর উদ্যোগে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে আইইউবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের। শিক্ষার্থীদের তৈরিা উদ্ভাবনী প্রকল্প ও প্রোটোটাইপ বাছাই করে সেগুলোকে আরও এগিয়ে নেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

 

আইইউবির স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজার ফর ইনোভেশন ড. জোয়াও ফিয়ালহো বলেন, ‘উদ্ভাবনের শেষ কথা হলো অর্থবহ পরিবর্তন আনা। আমরা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে একটি ধারণা শুধু ধারণা হয়ে থাকবে না; সেটি তৈরি হবে, পরীক্ষা করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তব প্রভাব তৈরি করবে। এই প্রচেষ্টায় আইইউবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’

 

সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং সেন্টার অব ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন—আইইউবি ৩৬০-এর পরিচালক ড. সাদিয়া বিনতে আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে আমরা যে ধরনের কাজ দেখেছি, সেগুলোকেই আমরা আরও সামনে এগিয়ে নিতে চাই। একটি ভালো প্রকল্প কোনো প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী বা একাডেমিক কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাওয়া উচিত নয়।’

 

অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা চারপাশের সমস্যাগুলো দেখুক এবং সেগুলোর সমাধান নিয়ে ভাবুক। নতুন কোনো ধারণা এলে সেটি নিয়ে কাজ করুক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুক এবং সম্ভব হলে বাস্তবে কাজে লাগানোর মতো কিছু তৈরি করুক। এবারের মেলায় আইইউবির আটটি প্রকল্প ছিল, এর মধ্যে দুটি সেরা ৫০-এ জায়গা পেয়েছে। আমাদের জন্য এটি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। আমরা চাই, আইইউবিতে এ ধরনের কাজ আরও হোক।’