পাবনায় স্কুলজীবন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক এবং এরপর বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, এমআইটি। সেখান থেকে একের পর এক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সেলিম এম. শাহরিয়ার। পদার্থবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।

১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া সেলিম শাহরিয়ারের শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে পাবনায়। পরে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে এবং ভর্তি হন এমআইটিতে। তাঁর এমআইটি জীবনের একাডেমিক অর্জন ছিল অসাধারণ। ১৯৮৬ সালে তিনি একই সঙ্গে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্স এবং পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্সে ১৯৮৯ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৯২ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল তিন স্তরবিশিষ্ট পরমাণুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও এর ব্যবহার।

এমআইটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অবশ্য পিএইচডিতেই শেষ হয়নি। পিএইচডি শেষ করার পর তিনি এমআইটির রিসার্চ ল্যাবরেটরি অব ইলেকট্রনিকসে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সেখানে গবেষণা বিজ্ঞানী এবং ২০০১ সালে প্রধান গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। পরে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন এবং ২০০৮ সাল থেকে সেখানে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক। পাশাপাশি নর্থওয়েস্টার্নের পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ফলিত পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত।

সেলিম শাহরিয়ারের গবেষণার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। পরমাণু ও ফোটনিক প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম যোগাযোগ, পারমাণবিক ঘড়ি, পারমাণবিক ইন্টারফেরোমেট্রি, আলোকভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি, অতি সংবেদনশীল পরিমাপ প্রযুক্তি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নর্থওয়েস্টার্নে তিনি ল্যাবরেটরি অব অ্যাটমিক অ্যান্ড ফোটনিক টেকনোলজিসের নেতৃত্ব দেন এবং সলিড স্টেট ও ফোটনিকস গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত।

তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণা। তিনি আন্তর্জাতিক লিগো সায়েন্টিফিক কোলাবোরেশনের সঙ্গে যুক্ত এবং ২০০৮ সাল থেকে এই বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার কাউন্সিল সদস্য ছিলেন। লিগোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ডিটেক্টর ব্যবহার করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার গবেষণায় তাঁর নাম একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রে রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ঐতিহাসিক গবেষণাপত্রে, যেখানে প্রথমবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়, সেখানেও সেলিম শাহরিয়ারের নাম সহলেখক হিসেবে রয়েছে।

২০১৬ সালের ওই আবিষ্কার বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে তৈরি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পৃথিবীতে পৌঁছানোর সংকেত লিগো শনাক্ত করে। এর মাধ্যমে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস সরাসরি পর্যবেক্ষণের নতুন যুগ শুরু হয়। সেলিম শাহরিয়ার এই বৃহৎ আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার অংশ হিসেবে পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। নর্থওয়েস্টার্নের প্রকাশনা তালিকায় তাঁর নাম GW150914, GW170817 এবং লিগোর বিভিন্ন পর্যায়ের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুসন্ধানসংক্রান্ত অসংখ্য গবেষণাপত্রে রয়েছে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণকে আরও সংবেদনশীল করার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো হোয়াইট লাইট ক্যাভিটি, যা মাইকেলসন ইন্টারফেরোমিটারভিত্তিক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারীর সংবেদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে অতি সংবেদনশীল ঘূর্ণন ও ত্বরণ পরিমাপ, সুপারলুমিনাল রিং লেজার এবং পারমাণবিক ইন্টারফেরোমেট্রি নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে।

তাঁর গবেষণা মহাকর্ষীয় তরঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কোয়ান্টাম যোগাযোগের পাশাপাশি তিনি পারমাণবিক ঘড়ি, ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান, সাধারণ আপেক্ষিকতার পরীক্ষা, আলোকভিত্তিক তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং অত্যন্ত নির্ভুল পরিমাপ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণাগারের প্রকাশনা তালিকায় ১৯৯০-এর দশক থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে গবেষণাপত্র রয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও তাঁর সহলেখকত্বে নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

পাবনা থেকে শুরু হওয়া যে শিক্ষাযাত্রা এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছিল, সেটিই পরে তাঁকে নিয়ে গেছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোর একেবারে কেন্দ্রে। বাংলাদেশে স্কুল ও কলেজের শিক্ষা শেষ করে এমআইটিতে একই সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স ও পদার্থবিজ্ঞানে ভিত্তি তৈরি করা সেলিম শাহরিয়ার এখন নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে নতুন প্রজন্মের গবেষকদের নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর পথচলা দেখায়, বাংলাদেশের একটি জেলা শহর থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাযাত্রাও বিশ্ববিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর গবেষণায় জায়গা করে নিতে পারে।