লেখা: তানভীর আহমেদ হিমেল 

একসময় একটি সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিককে ভাবতে হতো—তথ্যটি কতটা সত্য, কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের জানার জন্য কতটা প্রয়োজনীয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সাংবাদিকতার সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন একটি সংবাদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে—“এটি কত ভিউ পাবে?”

বর্তমানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে অনেক সময় সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও ‘ভিউ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য—সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া—কখনো কখনো পিছিয়ে পড়ছে জনপ্রিয়তা ও দ্রুত ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কাছে।

ভিউয়ের প্রতিযোগিতা ও ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সংবাদ যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটি তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আর এই মনোযোগ পাওয়ার জন্য অনেক সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করছে চটকদার ও অতিরঞ্জিত শিরোনাম।

“এই ঘটনা দেখে অবাক সবাই!”, “শেষ পর্যন্ত যা ঘটল!”, “ভিডিওটি না দেখলে বিশ্বাস করবেন না”—এ ধরনের শিরোনাম এখন অনলাইন সংবাদে প্রায়ই দেখা যায়। পাঠককে সংবাদে প্রবেশ করানোর জন্য এমন শিরোনাম তৈরি করা হলেও অনেক সময় শিরোনাম এবং মূল সংবাদের মধ্যে যথেষ্ট সামঞ্জস্য থাকে না।

এ ধরনের কৌশলকে বলা হয় ক্লিকবেইট (Clickbait)। এর উদ্দেশ্য মূলত পাঠকের কৌতূহল বাড়িয়ে তাকে সংবাদে ক্লিক করতে উৎসাহিত করা। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ক্লিক পাওয়ার জন্য তথ্যকে অতিরঞ্জিত, বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয়।

শুধু ছোট অনলাইন পোর্টাল নয়, বড় গণমাধ্যমও একই দৌড়ে

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো—এটি এখন শুধু ছোট বা অনির্ভরযোগ্য অনলাইন পোর্টালের সমস্যা নয়। প্রথম সারির অনেক গণমাধ্যমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছে।

একই গণমাধ্যম যখন পত্রিকা বা টেলিভিশনে তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায় সংবাদ প্রকাশ করে, তখন তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কখনো কখনো অনেক বেশি চটকদার শিরোনাম দেখা যায়। কারণ অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা শুধু অন্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নয়; প্রতিযোগিতা হচ্ছে অসংখ্য ভিডিও, পোস্ট, বিনোদনমূলক কনটেন্ট ও ব্যক্তিগত পোস্টের সঙ্গেও।

ফলে সাংবাদিককে এখন শুধু একজন রিপোর্টার হিসেবে নয়, একই সঙ্গে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেও কাজ করতে হচ্ছে। এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় নৈতিক প্রশ্ন—পাঠকের মনোযোগ পাওয়ার জন্য একজন সাংবাদিক কতটা পর্যন্ত শিরোনাম বা উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে পারেন?

অ্যালগরিদম কি সাংবাদিকতার ওপর প্রভাব ফেলছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত এমন কনটেন্টকে বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরে, যেগুলোতে বেশি ক্লিক, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার বা দেখার সময় পাওয়া যায়। ফলে মানুষের আবেগ, বিস্ময়, ভয়, রাগ কিংবা কৌতূহল তৈরি করে—এমন কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

এ কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জটিল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হয়তো খুব কম মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে একটি চটকদার শিরোনাম বা কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

এখানেই সাংবাদিকতার সঙ্গে অ্যালগরিদমের সংঘাত তৈরি হয়।

সাংবাদিকতার প্রশ্ন: কোন তথ্যটি মানুষের জানা প্রয়োজন?

অ্যালগরিদমের প্রশ্ন: কোন কনটেন্টে মানুষ বেশি সময় ধরে থাকবে?

দুই প্রশ্ন সবসময় এক নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্যের ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাংবাদিকতার জন্য শুধু প্রতিযোগিতা তৈরি করেনি; তৈরি করেছে ভুল তথ্য ও গুজবের নতুন ঝুঁকিও।

একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কোনো পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার ছবি হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সম্পাদিত ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে কিংবা কোনো ব্যক্তির বক্তব্যের একটি অংশ কেটে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য ভাইরাল হওয়া মানেই সেটি সংবাদ নয়। ভাইরাল হওয়া এবং সত্য হওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশের আগে উৎস যাচাই, একাধিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, ছবি ও ভিডিওর সত্যতা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইনেই যখন সবচেয়ে বেশি পাঠক, তখন দায়িত্বও বেশি

বর্তমানে মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক মানুষ দিনের শুরুতেই সংবাদপত্রের কাগজ হাতে নেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল ফোনে ফেসবুক, ইউটিউব বা সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট খুলে খবর পড়ছেন।

অর্থাৎ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি এখন অনলাইন। তাই অনলাইন সাংবাদিকতার মান উন্নত করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একজন পাঠক যখন কোনো সংবাদমাধ্যমের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটি খবর পড়েন, তখন শুধু ওই নির্দিষ্ট খবর সম্পর্কে নয়—পুরো সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হয়।

গতি বনাম নির্ভুলতা

অনলাইন সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত সংবাদ প্রকাশের চাপ।

একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে কে আগে খবর দেবে—তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিন্তু দ্রুত প্রকাশ করতে গিয়ে যদি তথ্য যাচাইয়ের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া হয়, তাহলে ভুল তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

একটি ভুল সংবাদ পরে সংশোধন করা হলেও প্রথম প্রকাশিত ভুল তথ্যটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক পাঠক সংশোধিত সংবাদটি দেখেনও না।

তাই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা জরুরি—

“সবার আগে” সংবাদ দেওয়ার চেয়ে “সবার আগে সঠিক” সংবাদ দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবাদিকতা কি ভিউয়ের জন্য, নাকি মানুষের জন্য?

একটি সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য পাঠক, দর্শক ও ভিউ গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপন, আয় এবং ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গেও পাঠকের সংখ্যা জড়িত। তাই ভিউ পাওয়ার চেষ্টা নিজেই অন্যায় নয়।

সমস্যা তৈরি হয় যখন ভিউ সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

একজন সাংবাদিক যদি মনে করেন—“যে খবর বেশি ভিউ পাবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ”, তাহলে ধীরে ধীরে জনস্বার্থের বদলে জনপ্রিয়তা সাংবাদিকতার বিষয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে।

ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা দুর্নীতি নিয়ে গভীর প্রতিবেদন কম গুরুত্ব পেতে পারে; অন্যদিকে তারকা, বিতর্ক, দুর্ঘটনা, অপরাধ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের চটকদার খবর বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

তাহলে সমাধান কী?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সাংবাদিকতার শত্রু হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এটিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে।

প্রথমত, সংবাদমাধ্যমকে ক্লিকের পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতাকেও সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিরোনাম আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই বিভ্রান্তিকর হওয়া উচিত নয়।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশের আগে যথাযথ ফ্যাক্ট-চেকিং ও ভেরিফিকেশন করতে হবে।

চতুর্থত, সাংবাদিকদের ডিজিটাল সাংবাদিকতার পাশাপাশি ছবি, ভিডিও, ডেটা ও অনলাইন উৎস যাচাইয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

পঞ্চমত, সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত নিজেদের প্ল্যাটফর্মে স্পষ্টভাবে সংবাদ, মতামত, বিজ্ঞাপন ও বিনোদনমূলক কনটেন্টের পার্থক্য তুলে ধরা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সাংবাদিককে মনে রাখতে হবে, একটি সংবাদ শুধু একটি ‘পোস্ট’ নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষের জীবন, সম্মান, অধিকার এবং কখনো কখনো একটি সমাজের ভবিষ্যৎ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাংবাদিকতার জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি একটি বিশাল সুযোগও। এর মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই সুযোগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন গতি ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে সত্য, নির্ভুলতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার সমন্বয় থাকবে।

ভিউ দরকার, পাঠক দরকার, জনপ্রিয়তাও দরকার। কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।

কারণ একটি সংবাদমাধ্যম হয়তো একটি চটকদার শিরোনাম দিয়ে এক দিনে লাখো ভিউ পেতে পারে; কিন্তু ভুল তথ্য দিয়ে যদি পাঠকের বিশ্বাস হারায়, সেই বিশ্বাস ফিরে পাওয়া অনেক কঠিন।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ভিউয়ের দৌড়ে সাংবাদিকতার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“কত মানুষ দেখল?” নয়, বরং “কতটা সত্য, কতটা প্রয়োজনীয় এবং কতটা দায়িত্বশীলভাবে আমরা তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিলাম?”

সাংবাদিকতা যদি ভিউয়ের কাছে নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সংবাদ হয়তো ভাইরাল হবে—কিন্তু সাংবাদিকতা তার মূল্য হারাবে।